মেহের আফরোজ শাওন। বাংলাদেহশের অতন্ত্য জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রী শাওন। তার অভিনেয় শৈলী দিয়ে দীর্ঘ প্রায় একযুগেরও বেশি সময় ধরে মাতিয়ে আসছেন দর্শকদের। চোটপর্দা থেকে বড় পর্দা সব জায়গায় তার অভিনয় শৈলী কুড়িয়েছে মানুষের প্রশংসা। তার অন্যতম বড় পরিচয় তিনি বাংলাদেশের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের স্ত্রী। শাওন শোস্যলা মিডিয়ায় বেশ সরব ভুমিকা পালন করেন। সমসাময়িক সব বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলে থাকেন ফেসবুকে। এ ছাড়াও তিনি তার জীবনে ঘটে যাওয়া স্মৃতিময় ঘটনাগুলো শেয়ার করে থাকেন তার ভক্তদের কাছে। এবার তেমনই একটি ঘটনা শেয়ার করলেন তিনি। পাঠকদের উদ্দেশ্যে স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো:-
নিষাদ নিনিত ছাড়াও আমার আরো একখান পুত্র আছে। তিনি অতি মিষ্ট স্বরে আমাকে মা ডাকেন। শুধু ’মা’ ডাকেন না- ’শাওন মা’ ডাকেন। উনার ’শাওন মা’ ডাকের ইতিহাসটা বলি...

২০১৮ এর কোরবানী ঈদের সরকারী ছুটির প্রথম দিন- শুক্রবার। পুত্রদ্বয়কে নিয়ে বন্ধুদের সাথে রওনা হয়েছি ’আরন্যক’ নামের এক ছায়াঘেরা মায়াময় রিসোর্টে। রিসোর্টটির স্বত্তাধিকারী সোহাইল আহমেদ (Sohail Ahmed) ভাই আমাদের অতিপ্রিয় একজন। ৩ গাড়ি ভর্তি করে দলবল নিয়ে যাচ্ছি সবাই। আমার গাড়িতে ’তিনি’ এবং তার ’মাম্মাই’ও আছেন।

আমি সামনের সিটে চালকের পাশে বসে দিক নির্দেশনা দিচ্ছি! সকাল ৮ টায় রওনা হয়েছি, ৫ ঘন্টা পার করেও গাজিপুর চৌরাস্তার কাছাকাছি গিয়ে আটকে আছি! সঙ্গের বাকি দু’টো গাড়ি অন্যপথ নিয়েছে। কেন যে আমি জিপিএস এর দেখানো পথে গেলাম! সবাই বিরক্ত! নিনিত প্রতি ৪ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড পরপর জিজ্ঞেস করছে "মা আর কতক্ষণ লাগবে?" আমি জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত। হঠাৎ এক চিপা রাস্তায় গাড়ি ঢুকিয়ে দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলাম আমরা। আমার গাড়িচালক গর্বিত গলায় বলল "দেখলেন ম্যাডাম কেমন ট্রিকস খাটায়ে গাড়িটা জ্যাম থেকে বাইর করে নিয়ে আসলাম!"



ঠিক এমন সময়ে গাড়ি হার্ড ব্রেক করতে বাধ্য হল। কিছু একটা হয়েছে, খুব হইচই। সামনের দু’তিনটা গাড়ি অতিদ্রুত ঘুরিয়ে উল্টোদিকে চলে যাচ্ছে। আমরা এমন বেকায়দায় আছি যে এগোতেও পারছি না, গাড়ি ঘুরাতেও পারছি না! দৌড়াদৌড়ি করা লোকজনের কাছ থেকে যা জানলাম সামনে অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। লেগুনা’র সাথে ধাক্কা লেগে একজন পথচারী স্পট ডেড! বেপরোয়া লেগুনা চালককে বাঁশ নিয়ে ধাওয়া করেছে জনগণ! তারা সামনে যেই গাড়ি পাচ্ছে সেটাই ভাঙছে!

২০১৮’র সেই সময়টায় বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারনে অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছিল। পরিবহন চালকদের অনিয়ন্ত্রিত চালনার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন শেষ হয়েছে মাত্র। এই অবস্থায় উত্তেজিত মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়ে কি অবস্থা হতে পারে তা সহজেই ভেবে নেয়া যায়। এমন সময় পেছনের সিট থেকে চিকন গলায় একজন জিজ্ঞেস করল- "মা আর কতক্ষণ লাগবে?"

আমি জবাব দিলাম না। সেই মুহুর্তে এই ঝামেলা থেকে কিভাবে বের হবো সেই চিন্তা করার চেষ্টা করছিলাম দ্রুত। পেছনের জন আবারো জিজ্ঞেস করলেন- "মা আর কতোক্ষণ লাগবে?"



এবার আমি একটু অবাক হলাম। প্রশ্নকর্তার কন্ঠ তো নিনিতের নয়! পেছনে তাকানোর আগেই তিনি স্পষ্ট গলায় বললেন- "শাওন মা... আর কতক্ষণ লাগবে?"

এই বলে তিনি সামনে এসে আমার কোলে চড়ে বসলেন।

সেদিনের ৪ বছর বয়েসী সেই রাজপুত্রের নাম শুদ্ধ স্বরবর্ণ। তিনি সামনে এসে বসার পর উত্তেজিত একদল লোক বাঁশ হাতে আমাদের গাড়ির দিকে এগিয়ে আসলেও আমি জানালার কাঁচ নামানোর পর আমাকে আর কোলের ছোট বাচ্চাটিকে দেখে ভদ্রভাবে বিকল্প পথ দেখিয়ে গাড়িটি ছেড়ে দিল!

আড়াই ঘন্টার পথ ৭ ঘন্টায় পেরিয়ে আরন্যকে পৌঁছলাম আমরা। আর বোনাস হিসেবে আমি পেয়ে গেলাম রেডিমেড আরেকখান পুত্র।

আজ (১৮ অক্টোবর) আমার পুত্র শুদ্ধ স্বরবর্ণের ৫ম জন্মদিবস।

আব্বা তোকে অনেক ভালোবাসা। ’শাওন মা’ তোর জন্য বড় একটা রেড প্রিংগেলস কিনে রেখেছি।



পুনশ্চ ১: স্বরবর্ণের মুখে ’শাওন মা’ শুনে নিনিত সাহেবের অভিব্যক্তি-

"মা একটা প্রশ্ন করি? তোমার তো দুইটা ছেলে আছেই, আরেকটা ছেলে তো তোমার আর দরকার নাই! তাই না মা?"

পুনশ্চ ২: আমাকে ’শাওন মা’ ডাকলেও নিজের মাম্মাই কে ’সাবা আন্টি’ ডাকেন জনাব শুদ্ধ স্বরবর্ণ।

পুনশ্চ ৩: রেডিমেড পুত্রের মা ডাকের কল্যাণে বেশকিছু নতুন রিউমারের জন্ম দিয়েছিলাম গত ডিসেম্বর মাসে সেন্টমার্টিনস যাত্রায়! সেই ভয়াবহ গল্প আরেকদিন শোনাব।

উল্লেখ্য, হুমায়ূন আহমেদের রেখে যাওয়া স্মৃতি ও তার দুই সন্তানকে নিয়ে বাকিটা জীবন কাটাতে চান জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন। নতুন করে সংসার বাধার চিন্তা নেই তাই প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রীর। হুমায়ূনের অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে হুমায়ূন আহমেদকে পৌঁছে দিতে চান শাওন। আর এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।