গেল একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বেশ ঘটা করেই মাঠে নেমেছিলো ঐক্যফ্রন্ট যার প্রধান হচ্ছেন ড.কামাল। গত নির্বাচনে তাকে ঘিরে বিএনপি অনেকটা আশায় বুক বেধেছিলো ঘুরে দাড়ানোর। আর তাদের সবথেকে বড় আশা ছিলো তার মাধ্যেমেই বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির।কিন্তু গেলো নির্বাচনে ভরাডুবির পর সেই আশা যেন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যায় বিএনপির। আর সেই সময়ে ড.কামালের দেয়া খালেদাজে সকল ভাষন যেন থেকে গেছে মুখে মুখেই। এখন কেমন যেন অনেকটা দায়সারা ভাবেই আছেন বাংলাদেশের এই জৈষ্ঠ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব্য।বিএনপির সঙ্গে ’নির্বাচনি ঐক্য’ গড়লেও দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নাম ভুলেও মুখে আনেন না জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান উদ্যোক্তা গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
এই মুহূর্তে বিএনপির যে মূল এজেন্ডা খালেদা জিয়ার মুক্তি, সে ব্যাপারে ড. কামাল হোসেনের অবস্থান দায়সারা।


জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো অনুষ্ঠানে নিজে থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করেন না ড. কামাল হোসেন। বিষয়টি কেউ স্মরণ করিয়ে দিলে দায়সারা গোছের ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ’হ্যাঁ, এটা তো আমিও চাই। এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই। এটা তো আমাদের অনেকগুলো দাবির মধ্যে একটি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সংকটকাল উত্তরণ এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে আজন্ম সখ্য’র কারণে গায়ে লেগে যাওয়া ’স্বাধীনতাবিরোধী’ তকমা মুছে ফেলার তাগিদেই বঙ্গবন্ধুপ্রেমে বুঁদ ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠনে রাজি হয়েছিল বিএনপি। কিন্তু তখন পর্যন্ত বিএনপি ধারণা করতে পারেনি, ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মঞ্চে শুধু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে কথা হবে, জয়বাংলা স্লোগান উঠবে! জিয়াউর রহমানের নাম ভুলেই উচ্চারণ করবেন না ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব বা মাহমুদুর রহমান মান্না!

কিন্তু গত এক বছরে সেই ঘটনাটিই ঘটেছে। গত বছর ১৩ অক্টোবর থেকে এ বছর ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যতগুলো সভা-সমাবেশ, আলোচনা-সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন, বৈঠক বা নীতিনির্ধারণী সভা হয়েছে, তার কোনোটিতেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ করেননি ড. কামাল হোসেন। জোটের অন্য দুই শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাও জিয়াউর রহমানের নাম মুখে আনেননি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বর্ষপূর্তির দিন গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি ’জমায়েত’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে আয়োজিত ওই জমায়েতে ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির প্রতিনিধি হিসিবে উপস্থিত ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, ’দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, যে সরকার এখন আছে, যে দলের নাম নিয়ে তারা দেশ শাসন করছে, এই দলে আমরা সবাই ছিলাম। এই দলের সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে, সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম।’

ড. কামাল হোসেনের ওই বক্তব্যের মধ্যেই দর্শক সারি থেকে একজন বিএনপিকর্মী উঠে দাঁড়ান। উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ’জিয়াউর রহমানের নাম নেই কেন। আপনি (ড. কামাল) কি শেখ মুজিবের রাজনীতি করতে এসেছেন। এরপর জিয়াউর রহমানের নাম না নিলে আপনাকে আর প্রোগ্রামে আসতে দেওয়া হবে না।’

পরে বিএনপির অন্য কর্মীরা ক্ষুব্ধ ওই কর্মীকে শান্ত করেন। এ সময় মঞ্চে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে কিছুটা বিব্রত দেখা যায়। অস্বস্তির ছাপ ফুটে ওঠে তার চেহারায়। পাশ থেকে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ড. কামাল হোসেনকে কিছু একটা বলেন। ড. কামাল হোসেন তখন বলেন, ’হ্যাঁ, খালেদা জিয়ার মুক্তি তো আমিও চাই। এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শুধু মাঠ পর্যায়ের কর্মী নয়, বিএনপির নেতৃত্ব পর্যায়ে যারা আছেন, তারাও ড. কামাল হোসেনের বঙ্গবন্ধুপ্রেম এবং জিয়াউর রহমানের ব্যাপারে উদাসিনতা নিয়ে বিব্রত এবং ক্ষুব্ধ। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি থেকে একে এ কে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. মঈন খানের সরে যাওয়া— সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

অবশ্য এ বিষয়গুলোকে ধর্তব্যের মধ্যে নিতে চান না জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। তারা মনে করেন, ছোট-খাটো এসব বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিলে মূল উদ্দেশ্য থেকে দৃষ্টি অন্য দিকে সরে যাবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সারাবাংলাকে বলেন, ’হ্যাঁ, আগের প্রোগ্রামগুলোতে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এ ধরনের কিছু হৈ চৈ লক্ষ্য করেছি। কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে, কোনো দলের নেতাদের নামজপ করার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী?— তা পরিষ্কার করে বলে দেওয়া আছে। আর রেফারেন্স হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম না এলে, তার নাম কীভাবে নেব?’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আরেক নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ’জিয়াউর রহমানের নাম নেওয়ার জন্য তো একটা যোগসূত্র থাকতে হবে। আর খালেদা জিয়ার নাম তো বার বার বলা হয়, তাতে কি জিয়াউর রহমানের নাম বাকি থাকে? এখনি আমি যদি বলি, বিএনপির যেসব লোক প্রোগ্রামে এসে লাফালাফি করে, তারা মাঠে নামে না কেন?’ তারা নিজেরা কয়দিন জিয়াউর রহমানের নাম নেয়?’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ’আমরা বিএনপির সেন্টিমেন্ট বুঝি। কিন্তু বিএনপিকেও বুঝতে হবে ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু তাকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধুর অবদান অনেক। সে কারণে তিনি বঙ্গবন্ধুর কথাই বেশি বলেন। আর আমরা তো জিয়াউর রহমানের কথা বলি। ভবিষ্যতে আরও বেশি করে বলব।’

তবে এসব ব্যাপারে বিএনপি নেতারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। দলটির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে তারা এড়িয়ে যান। স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় ’এ নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হবে। এ কারণে কিছুই বলতে চাই না।’


প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২-এর ৮ই জানুয়ারি শেখ মুজিবের সঙ্গে মুক্তি দেয়া হয় ড.কামালকে। তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে ১০ জানুয়ারি লন্ডন হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি সর্বদাই সোচ্চার। তাকে ব্যক্তিগত সততা, ন্যায্যতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসাবে সাধারণভাবে সম্মান করা হয়। তবে বাংলাদেশের একজন বড় রাজনৈতিক কিংবা বঙ্গবন্ধুর সহচর হিসেবে নয় বরং বাংলাদেশের সংবিধানের প্রণেতা হিসেবেই অধিক পরিচিত।তবে রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সবসময়ই সোচ্চার।